The Planning: 9th April 2019

সাইবার ক্যাফেতে LCD স্ক্রিনে প্রায় ডুবে রয়েছি, সহসা পকেটে স্মার্টফোনের ভাইব্রেশন অনুভূত হলো।ফোন বের করে দেখি স্ক্রিনে দেবাশিসের(মামার ছেলে) জিও নম্বর ভেসে উঠছে।ক্যাফেতে গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ করছিলাম তাই ফোন কেটে দিলাম, ভাবলাম পরে ফোন করবো। কিছুক্ষন পরেই দেখি আগের ঘটনার পুনরাবৃত্তি। ভাবলাম এবার রিসিভ করি,বারবার যখন ফোন করছে তাহলে হয়তো কোনো কোনো দরকারি কথা আছে। রিসিভ করতেই ‘হ্যালো’ এর জায়গায় চার অক্ষরের একটি ‘সুমিষ্ট’ ডাক শুনলাম, কান যেন ধন্য হয়ে গেলো। যাই হোক, কোনো ভনিতা না করেই বললো, “আগামী 12 এপ্রিল মৌসুনি দ্বীপ হয়ে বকখালি যাবো, ব্যাগ পত্র সব গুছিয়ে রাখিস।” মিনমিন করে আমার আর্থিক সমস্যা-অন্যান্য সমস্যার কথা বলতেই দেখি ফোন কেটে যাওয়ার শব্দ।যা বাবা! এরকম হঠাৎ করে পত্রপাঠ ট্যুর তো বেশ চাপের ব্যাপার। কিন্তু সুখের ব্যাপার, আমার আর্থিক সমস্যা-অন্যান্য সমস্যা কিছুই ধোপে টিকলো না। মানে যাওয়া কনফার্ম আর কি !

Luck was with me: 12th April 2019 (03:42 A.M.)

জানিয়ে রাখি, অধমের বাড়ি শুধু অশোকনগরে, বাকি সবাই এর নিবাস গুমা। যাই হোক, নির্দিষ্ট সময়েই সবাই স্টেশনে এসে শিয়ালদহ এর উদ্দেশ্যে 03.42 এর দিনের ফার্ষ্ট ডাউন ট্রেন ধরলাম।ভাগ্য ভালো বলতে হবে, উঠেই সিট পেয়ে গেলাম।ফার্ষ্ট ডাউন বনগাঁ লোকালে ট্রেনে সিট পাওয়া আর লটারি যেটা প্রায় একই ব্যাপার কারন ফার্ষ্ট ট্রেনে মানুষের বদলে ফুলের বস্তা বেশী যায়।ডাইনে-বাঁয়ে-উপরে-নিচে সবজায়গাতেই ফুলের রমরমা। শিয়ালদহ নেমে আমাদের টার্গেট ছিল 5.12 এর লক্ষ্মীকান্তপুর লোকাল।রানিং এ নেমেই সবাই ‘উসেইন বোল্ট’ স্মরণ করে সাউথ প্ল্যাটফর্মে গিয়ে 05.12 এর লক্ষ্মীকান্তপুর লোকাল পেয়ে গেলাম। ওই ট্রেনটিই আবার 06.52 এ লক্ষ্মীকান্তপুর পৌঁছে 07.01 এ নামখানার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যায়।

Mousuni Island © Manaska Mukhopadhyay (Izifiso Tours Private Limited)

First part of our plan – Mousuni Island : 12th April 2019 (08:00 A.M.)

যাই হোক, সকাল আটটার সময় নামখানা পৌঁছে মুড়ি-ঘুগনি খেয়ে আর জলের বোতল নিয়ে স্টেশনের বাইরে বেরোলাম।দেখলাম মুড়ি-ঘুগনি এখানের বেশ প্রসিদ্ধ খাবার।আমাদের প্ল্যান অনুযায়ী প্রথমে যাবো মৌসুনি, তারপর বকখালি। অগত্যা টোটো ধরলাম স্টেশনের বাইরে থেকে। যাবো হাতানিয়া-দোয়ানিয়া নদীর ওপারে।ব্রিজ যেহেতু তৈরি হয়ে গেছে, তাই টোটো,ভ্যান আর ছোটখাটো গাড়ি ব্রিজ পারাপার করতে পারে।ব্রিজের ফাইনাল কাজ,আলোকস্তম্ভ,টোলের কাজ চলছে।যাই হোক 20 টাকা মাথাপিছু রফা হলো। নামলাম ব্রিজের ওপারে। মৌসুনি আইল্যান্ড যাওয়ার জন্য এখান থেকেই ম্যাজিক ভাড়া করা হল। দরদস্তুর করে 350 টাকায় রফা হলো।117 নং হাইওয়ে ধরে ছুটলাম। কিছুক্ষন পরেই হাইওয়ে ছেড়ে ডানদিকে বাঁক নিলাম। এবার রাস্তার দুপাশের সবুজের অবস্থান দেখে চোখ জুড়িয়ে গেলো। অবশ্য কিছু জায়গায় রাস্তাঘাটের অবস্থা খুবই খারাপ।কতবার যে ব্রহ্মতালুর সাথে গাড়ির ছাদের ‘যোগাযোগ’ ঘটলো তা ভগবানই জানেন। অবশেষে খেয়াঘাটে পৌঁছলাম।ওপরেই আমাদের স্বাগত জানাতে তৈরি মৌসুনি আইল্যান্ড। কাঁচা জেটিঘাট এবং খুব পেছল,তাই অত্যাধিক সাবধানে নৌকাতে উঠতে হয়। দিলদরিয়া মাঝিভাইয়ের সাথে আড্ডায়-তাঁর মোবাইলের গানে দিলখুশ হয়ে ওপারে পৌঁছলাম। খেয়াভাড়া 2 টাকা। খিদেও পেয়েছে,ঘাটের একটু পাশেই নদীর পাড়ে বাজার রয়েছে। বাজারে গিয়ে নদীর তীর সংলগ্ন একটি মিষ্টির দোকানে পেটাইপরোটা, অমলেট, দই,কোল্ডড্রিঙ্কস সহযোগে উদরপূর্তি হলো।তারপর কিছু শুকনো খাবার আর জল ব্যাগভর্তি করে চললাম পাশেই টোটো স্ট্যান্ডের উদ্দেশ্যে।আবহাওয়া একটু ভ্যাপসা।অভিজ্ঞ টোটোওয়ালারা দেখেই বুঝে নিলো সমুদ্রবিচে যাবো। ভাড়া এখানে পূর্বনিধারিত 25 টাকা। ক্রমে বসতবাড়ি,পুকুর,বিদ্যালয়,স্বাস্থ্যকেন্দ্র ডাইনে-বাঁয়ে রেখে চললাম সমুদ্রের আহ্বানে। কিছুক্ষন পরেই একটু দূরেই দৃশ্যায়িত হলো গঙ্গার আবছা একটি শাখা। বলাবাহুল্য, হুগলী নদী এই অঞ্চলেই অনেকগুলো শাখা সৃষ্টি করে সমুদ্রে বিলীন হয়েছে। ক্রমশঃ এগোতে লাগলাম সরু সিমেন্টের রাস্তা ধরে। আমরাও ছাড়াও অনেক ট্যুরিস্টদের দেখলাম একই রাস্তায় একই গন্তব্যস্থলের উদ্দেশ্যে। হয়তো তারা বিভিন্ন ক্যাম্পে মাটির ঘর কিংবা তাঁবু বুক করেছেন, যেগুলো অনলাইনে বুক করা যায়।
অনেকখানি পথ অতিক্রম করেই টোটো হঠাৎ একজায়গায় থেমে গেলো। সামনে রাস্তার কাজের জন্য রাস্তা কাটা হয়েছে, অগত্যা টোটো আর যাবে না। তাই টোটোওয়ালা 20 টাকা করে নিলো 25 এর জায়গায়। বাকি পথটুকু অবশ্য বেশি নয়। পায়ে চলা পথ।ঘন গাছপালার আড়ালে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কিছু বাড়ি। একটু পরেই কর্নগোচর হলো ঢেউএর আওয়াজ।শুধু কর্নগোচর কেন, মুহূর্তের মধ্যেই চক্ষুগোচর হলো বে অফ বেঙ্গলের জলরাশি। নিরিবিলি সমুদ্রসৈকত। চারপাশের বিভিন্ন ক্যাম্প (Backpackers’ Camp)। মাছধরার নৌকা কিছু এদিকে ওদিকে। দূরে দৃশ্যমান গঙ্গার মোহনা,জম্বুদ্বীপ(এক্ষেত্রে বলে রাখি, জম্বুদ্বীপ সম্পূর্ন সংরক্ষিত এলাকা এবং জনমানবহীন। শুধু মাছ ধরার মরসুমে মৎস্যজীবীরা সেখানে মাছ ধরার কাজে যেতে পারেন। ফ্রেজারগঞ্জ থেকে ভুটভুটি রিজার্ভ করে যাওয়া যায় জম্বুদ্বীপের সামনে, ভাড়া 1300-1600 এর মধ্যে)।একটু দূরেই ক্যাম্পের কিছু ট্যুরিস্ট সমুদ্রস্নানে মগ্ন,কেউবা ফটোশ্যুতে ব্যস্ত।আমরা ব্যাগ থেকে ফ্লেক্স বের করে যে যার ব্যাগপত্র তার ওপরে রাখলাম।ধড়াচূড়ো চেঞ্জ করে শুকনো খাবার গলাধঃকরণ হলো। তারপর সবাই মিলে সিদ্ধান্ত হলো সমুদ্রস্নানের।আমাদের মধ্যে একজন ব্যাগপত্রের পাহারায় রইলো,পরে কেউ স্নান কমপ্লিট করে তার স্থলাভিষিক্ত হলেন। ছুটে গেলাম নিরিবিলি বিশালাকায় জলরাশির টানে।আশ মিটিয়ে স্নান করলাম। এত নিরিবিলি সমুদ্র, যেটা সত্যিই সচরাচর পাওয়া যায় না।এটিও একটি অসাধারন উপভোগ্যকর জিনিস। যদিও ঢেউ এর তীব্রতা নেই তবুও মন-প্রাণ জুড়িয়ে গেলো।বেশ অনেক্ষনই স্নান করলাম। খেয়াল হলো, আমাদের পরবর্তী গন্তব্য বকখালি।অগত্যা পুনরায় ধড়াচূড়ো পরিধান করতে হলো। সবাই মিলে কিছু ফটোশ্যুটও হলো এখানে।

We the explorers of Bay of Bengal : 12th April 2019 (02:00 P.M.)

A moment to be remembered forever

আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ফ্রেজারগঞ্জ-বকখালি। আশেপাশে দেখি অনেক নৌকোই বালিতে বিদ্যমান। স্থানীয় একজন লোককে বকখালি যাওয়ার কথা বলতেই ভাড়া হাঁকালো 11 জনে 1500 টাকা। দরদস্তুর করে শেষমেষ 1300 টাকায় রফা হলো। আর 4 লিটার ঠান্ডা জল নিলাম পাশের একটি ক্যাম্প থেকে, 80 টাকা নিলো।
এরপর যে খেলটি হলো তার অভিজ্ঞতা এই জীবনে অন্ততঃ ভুলবো না।নৌকো তো বালির ভেতরে দাঁড় করানো ছিলো। সেই ভারী নৌকো অনভিজ্ঞহাতে ঠেলে-ঘুরিয়ে সমুদ্রে নিয়ে যেতেই অবস্থা টাইট হয়ে গেলো। যাই হোক আমাদের 11 জন এবং নৌকার দুজন সহ প্রায় আধঘন্টার পরিশ্রমে নৌকো অবশেষে জলে নামলো।
নৌকোর গলুইতে সবাই উঠে বসলাম।প্রায় 50 মিনিটের যাত্রা শুরু হলো ফ্রেজারগঞ্জ-বকখালির উদ্দেশ্যে। জম্মুদ্বীপকে ডানদিকে রেখে ভেসে চললাম সমুদ্রপথে। ক্রমশঃ দূরে মিলিয়ে যেতে লাগলো গঙ্গার মোহনা। দূরে আবছা দুএকটি জাহাজও দেখা যেতে থাকলো। সমুদ্রপথে যাওয়ার সময় দেখলাম কিছু পাখি জলে ঝাঁপিয়ে পরে মাছ শিকার করছে। নাম অবশ্য জানি না পাখিগুলোর , লেন্সবন্দী করার কথা অবশ্য ভুলি নি। ততক্ষনে আমাদের নৌকোর হাল ক্রমশঃ বাঁদিকে টার্ন নিচ্ছে।আমরা ফ্রেজারগঞ্জের দিকে এগোচ্ছি।দূরের চড়ায় কিছু ট্রলার সারিবদ্ধভাবে বিদ্যমান। অবশেষে সমুদ্রপথ ছেড়ে আমাদের নৌকো ঢুকলো ফ্রেজারগঞ্জের খালপথে। খালপথের দুদিকে গভীর মানগ্রোভের সারি। জোয়ারের জলে ডুবন্ত কিছুগাছের মাথা শুধু দৃশ্যমান। কিছুক্ষন পরেই আমাদের নৌকো থামলো ফ্রেজারগঞ্জ মৎস বন্দরে। দূরে তখন প্রচুর বিভিন্ন নামের ট্রলারের সারি, দেখেও চমৎকৃত হলাম। কিছু নৌকোর গলুইতে দেখতে পেলাম সামুদ্রিক চিংড়ি-লটে মাছের সমারোহ।খিদে পেটে গরম ভাতের সাথে লটেভর্তার কল্পনা করে জিভ দিয়ে যে খানিকটা জল গড়ালো না, তা অবিশ্যি বলবো না। জেটিতে নেমে কিছু ফটো নিলাম। পাশেই অনেকগুলো মৎসনিলাম কেন্দ্র। একজন ডাবওয়ালা ও দেখতে পেলাম। বিভিন্ন দামের ডাবের সমারোহ সেখানে, 15-20-25 টাকার। তীব্র গরমে তেষ্টা তো পেয়েছিলোই, অগত্যা ডাবের জল আর ডাবের শাঁস গলাধঃকরণ করে যেন কিছুক্ষন পেটের শান্তি বজায় রইলো।
বকখালি থেকে যারা ফ্রেজারগঞ্জ মৎস্যবন্দর দেখতে আসেন, তারা টোটো বা বিভিন্ন গাড়ি রিজার্ভ করেই আসেন। কিন্তু আমরা তো উল্টোপথে এসেছি, কাজেই টোটো বা অন্যান্য গাড়ি আমাদের জন্য সেখানে অপেক্ষা করবে না তা বলাই বাহুল্য। ভাবছি হেঁটেই মেরে দেবো কি না বাকি রাস্তা! এমন সময় মৎস্যআড়তের একটি লোকের ব্যবস্থাপনায় টোটোর ব্যবস্থা হয়ে গেলো, ভাড়া 20 নাহলে 25 টাকা!সঠিক মনে পড়ছে না।

A low cost mouth watering decision

On our way to Bokkhali : 12th April 2019 (04:00 P.M.)

বেশ নিরিবিলি রাস্তা! কিছুটা চলার পর সাগরকন্যা হোটেলকে ডানদিকে রেখে 117 নং হাইওয়ে তে পড়লাম। ডানদিকে বিভিন্ন হোটেল-বায়ুপাখা গুলোকে রেখে কিছুক্ষন পরেই নামলাম বকখালি বাসস্ট্যান্ডে। ক্লান্ত-শ্রান্ত শরীর, পেটে তো খিদেয় ছুঁচো অলরেডি বহুক্ষণ আগে থেকেই ডনবৈঠক শুরু করেছে।হোটেল খোঁজার আগেই বাসস্ট্যান্ড মোড়ে বনশ্রী নামে একটি AC হোটেলে ঢুকলাম পেটপুজোর উদ্দেশ্যে। বিভিন্নজনের চাহিদামত কেউ চিকেন মিল,কেউ রুইমাছ মিল আবার কেউ সবজি মিলের অর্ডার করলো।মিল মানে ভাত-ডাল-সবজি যতখুশি নেওয়া যেতে পারে কিন্তু মাছ একপিস বা চিকেন চারপিস। শেষপাতে একটু চাটনি আর একটুকরো পাঁপড়। বিভিন্ন রকম মিল পাওয়া যায় !* অবশেষে মহাসমারোহে পেটপুজোর মহান কার্য সমাধা করে চললাম হোটেল বুক করতে। ব্যাগের যা ওজন, তাতে মাঝেমাঝে নিজেদের পিঁপড়ের বিশেষে গুণের কথা নিরন্তর মনে হতে থাকলো। পিঁপড়ে যেমন নিজের দেহের তুলনায় অতিরিক্ত ওজন বহন করতে পারে সেই গুণের কথা আর কি ! রাস্তাঘাটে হোটেলে ট্যুরিস্ট খুবই কম চোখে পড়লো, অফসিজন বলেই বোধ হয়। বাসস্ট্যান্ডের পিছনেই দুএকটি হোটেল দেখলাম।অফসিজন বলেই বোধ হয় হোটেলভাড়া যথেষ্ট কম। তিনটে রুম বুক করা হলো।ব্যাচেলর ছেলেপিলে যেহেতু, মিলেমিশে থাকতে কোনো বাধাই নেই। প্রত্যেকের ID কার্ড দেখে হোটেলের জাবদা খাতায় রুমের এন্ট্রি হলো, সাথে আমাদেরও। রুমে ঢুকেই পিঠে ভারী ব্যাগ নিয়ে প্রায় চলৎশক্তিহীন অবস্থায় হোটেলের বিছানায় ঝাঁপিয়ে পড়লাম সবাই।কিন্তু আশ্চর্য হলাম যখন দেখলাম, তিনটি 80 কেজির বপু সবেগে বিছানায় পড়া সত্ত্বেও খাটের মড়মড় আওয়াজ না শুনে। রহস্য ভেদ করতে গিয়ে চক্ষু চড়কগাছ, হোটেলমালিকের বুদ্ধির তারিফ না করে পারলাম না। আসলে খাটটি সিমেন্টের তৈরী।

We are ready for Beach : 12th April 2019 (05:00 P.M.)

বিকেল থেকে ক্রমশঃ সন্ধ্যা হয়ে আসলো।প্রকৃতির ডাক-স্নান সেরে বেশ মৌতাতে FLAKE (not recommended) ধরিয়ে বিচে যাওয়া মনস্থির করলাম।এর আগেও 2013 সালে বকখালি এসেছিলাম, সেই স্মৃতি মনের অন্দরে উঁকি দিলো ।অগত্যা রোমন্থন করতেই বা বাধা কোথায়!বিচে ট্যুরিস্ট এর ভিড় খুবই কম।বরাবরই সমুদ্রের বুকে সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত দেখাটাও অসাধারণ একটি পাওনা।বেশ যেন মাদকতা ছড়িয়ে দেয়। সারি সারি মনোহারি দোকান,ফুচকার দোকান,মাছভাজার দোকান বিচে আমাদের পকেট খসাবার জন্যে একদম রেডি।একটু দূরে সারি সারি চেয়ার পাতা। সমুদ্রের ঠান্ডা ফুরফুরে হাওয়ায় চেয়ারে বসে থাকতে থাকতে আকাশপাতাল কল্পনা করতে বেশ ভালোই লাগে, সাময়িক কবি হওয়াও যদিও অসম্ভব নয়।এক্ষেত্রে চেয়ার ভাড়া ঘন্টায় 10 টাকা। অবশ্য ফিক্সড রেট নয়, আপনি বেশিক্ষন বসতে চাইলে দরাদরিও করে নিতে পারেন।মাঝে মাঝে আবার মাথা-ঘাড় ম্যাসাজ করারও লোক দেখলাম। সমুদ্রাপাড়ে চেয়ারে বসে অনেকেই দেখলাম তার খদ্দের।

একপ্যাকেট ফ্লেক তো কিনলামই, সমুদ্রপারে আরও একটু মৌতাত আসার জন্য একপ্যাকেট স্ট্রবেরী ফ্লেভারের টোটাল সিগারেটও নিলাম। এই স্ট্রবেরি ফ্লেভারের টোটাল সিগারেট দোকানে কিনতে গেলে সময়ে ভারী সমস্যায় পড়তে হয়।ভিড় দোকানে দোকানদারকে যদি বলি, এক প্যাকেট স্ট্রবেরি ফ্লেভার দিন তো ! আশেপাশের লোকজন তো বটেই, মায় দোকানদারও কখনোও বিস্ময় মাখানো কৌতূহলোদ্দীপক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে।শুধু তাকিয়ে থাকা নয়, রীতিমতো নিচুস্বরে গবেষণা চলতে থাকে। অবশেষে সিগারেট শব্দটি যোগ করলে সবার যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ে।

সিগারেট ধরিয়ে জায়গায় জায়গায় ধূম্রকুঞ্জ সৃষ্টি করে হাঁটতে থাকলাম সমুদ্রের উদ্দেশ্যে। বকখালির সংলগ্ন সমুদ্র ভৌগোলিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী অগভীর সমুদ্র। বকখালি সন্নিহিত সমুদ্রের একটু বিশেষ দিক হলো জোয়ারের সময় আপনি যেখানে স্নান করবেন, ভাঁটাতে সেখানে জল থাকে না, পড়ে থাকে সমুদ্রের বালিতট। নিচু খাতগুলোতে জল জমে থাকে।তবে হাঁটুজলের বেশি জল থাকে না সেসব তটগুলিতে।ভাঁটার সময় সেইসব বালিখাত হেঁটে অনেকদূর যাওয়া যায়।তখন সমুদ্র বহুদূরে চলে যায়।এখানের ঢেউ এর তীব্রতা পুরী-দীঘা এর সমুদ্রর চাইতে যথেষ্টই কম।অনেকে ভাটার সময় বিকেল-সন্ধেবেলা দূরে গিয়েও সমুদ্রস্নান করে।অনেক দূরের নিরালা-নির্জন সমুদ্রসৈকতে যখন ছোট্ট ছোট্ট ঢেউ আসে পা ভিজিয়ে দেয়, তার সাথে থাকে যখন সিগারেটের মৌতাত, সেই সময় অসাধারন একটি সুখকর অনুভূতির সঞ্চার হয়।কিংবা পশ্চিমে সূর্যাস্তের সময় দিগন্তপারে প্রেমিক-প্রেমিকার হাত আলিঙ্গনবদ্ধ অবস্থায় সমুদ্রের ছোট্ট ঢেউ যখন তাঁদের পদযুগলে আঘাত করে,তখন হয়তো সৃষ্টি হয় স্বর্গীয় একটি অনুভূতি। সাময়িক কবিরূপত্বে ছেদ পড়লো, সন্ধ্যের খিদেপেটে ছুঁচোর আনাগোনায়।কিছু যে না খেলেই নয়। ভাবলাম এই ফুরফুরে ঠান্ডা বাতাসে গরম গরম মাছভাজা বেশ জমবে। মাছভাজার দোকানের সামনে গিয়েও থমকে দাঁড়ালাম, মন বললো ফুচকার কথা। এই থমকে দাঁড়ানোটা, পরে একটা ক্ষতিকর জিনিসের হাত থেকে বাঁচিয়েছিলো। সেই কথা একটু পরেই বলছি।** ফুচকার দোকানে গেলাম, দাম জিজ্ঞেস করতেই বললো 10 টাকায় 6 টা, অবশ্য ফুচকার সাইজ ভালোই। সিজনে এটাই টাকায় 5 টা হয়ে যায়। 4 জন ফুচকা খেতে দাঁড়ালাম। সবাই খুব ঝালপ্রিয়, অথচ আমি ঝাল একদম খাই না। অগত্যা মহান হৃদয় ফুচকাওয়ালা আমার জন্য ঝালবিহীন আলু বানালেন। খিদেও পেয়েছে, প্লেট দেওয়ার সাথে যেন জিভ পুরো জলে পরিপূর্ণ হয়ে গেলো! অপেক্ষা করলাম কখন আসবে ফুচকা, তিনজনের পরে যখন প্লেটে ফুচকা আসলো মুখে দিয়েই চোখবন্ধ হয়ে গেলো আপনা আপনি। ফুচকা মুখে দিলেই চোখ বন্ধ হওয়াও যেন একটি অলিখিত নিয়ম। যাই হোক, মাঝে মাঝেই ভুলক্রমে ফুচকাওয়ালা অন্য তিনজনের ঝাল আলু আমাকে দিয়ে দিচ্ছিলেন। পরিশেষে যা হলো আর কি! আইসক্রিমের খোঁজ লাগাতে হলো। অবিশ্যি পাশেই আইসক্রিমওয়ালারা সতেজে বিরাজমান ছিলেন, তাই রক্ষে আর কি। চকোবার,বাটি কিংবা অন্য আইসক্রিম নিলাম না কারন সেগুলো নরম আইসক্রিম, তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেলে ঝালের উপশম হবে না। কমদাম দিয়ে শক্ত একটি অরেঞ্জ আইসক্রিম কিনে খেতে খেতেই হোটেলে ফিরতে হবে। স্থানীয় হোটেল থেকে ডিমের কারি(হোটেলে ডিমের কারি/ডিমের ঝোল/ডিমকষা সবই একই জিনিস অর্থাৎ ডিমের পাতলা ঝোল) আর রুটি খেলাম। আটার রুটি 4 টাকা পিস।খেয়ে একটি মোটামুটি বড়ো স্টেশনারী দোকান থেকে বিসলেরি এর 5 লিটার এর ঠান্ডাজার কিনলাম। দাম যেটা প্রিন্টেড ছিলো, সেটাই নিলো অর্থ্যাৎ 60 টাকা। ছোট দোকানে অনেকসময় 65 টাকাও নেয়। একটা জিনিস লক্ষ্য করলাম, বিভিন্ন ট্যুরিস্ট স্পটে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের জল পাওয়া যায়, সেটা বিসলেরি,কিনলে কিংবা লোকাল ব্র্যান্ড ও হতে পারে কিন্তু বিসলেরি এর দাপট যেন বরাবরই সবচেয়ে বেশি। ফিরে আসলাম হোটেলের সেই সিমেন্টের বিছানায়। ***
এতক্ষন পর্যন্তঅনেক জ্ঞান দিয়ে ফেললাম একদম বিনা পয়সায়, তাও অহংকার নেই আমার একটুও।সাথে বই নিয়ে এসেছিলাম, শিবশঙ্কর মিত্রের “সুন্দরবন সমগ্র” । দু পাতা চোখ বোলাতেই স্বপ্নে নিদ্রাদেবী আবির্ভুত হলেন, তারপর আর কি! রুমজুড়ে নাসিকাগর্জন।

Few advice and information:

* যেমন সবজিমিল,রুইমাছ মিল,মাটন মিল,চিকেন মিল,কাতলা-কাঁকড়া-পমফ্রেট-গলদা-বাগদা-ইলিশ মিল। অফসিজনে অবশ্য সব মিল সব হোটেলে পাওয়া যায় না। মিলের রেট 50 টাকা থেকে 400 টাকা পর্যন্ত, অবশ্য বিভিন্ন হোটেলে রেট রকমফের হতে পারে। খেতে খেতে মনে হলো দু-একটি হোটেল ছাড়া বেশিরভাগ হোটেলে চিকেন কিংবা মাছ এড়িয়ে যাওয়াই ভালো। রান্না যেমন বিস্বাদ, তার চাইতেও আগেরদিনের রান্না খাবার গরম করে পরিবেশন করতে এদের বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই। সবচেয়ে ভালো চিকেন/মাটন/মাছ কিনে দিলে বিভিন্ন হোটেলে রান্না করে দেয়। রান্না মোটামুটি ভালো করে, তার চাইতেও বড় কথা টাটকা টাটকা জিনিস খাওয়া যায়। রান্নার রেট 1 কেজি চিকেন 100 টাকা। সমস্ত মশলা ওদের, মাংসে আলু দিলে সেটা অবশ্য আপনাকে কিনে দিতে হবে।

** অনেকগুলো মাছভাজার দোকান ছিলো,ভাবছি কোনটায় ঢুকবো। অনেক ট্যুরিস্টরাও দেখি খাচ্ছেন। অবশ্য অফসিজন, তাতে আবার মাছের অবস্থা দেখে ভক্তি হলো না।কোনো একসময় কাজের সূত্রে মাছের আড়তে থাকতাম, প্রচুর সামুদ্রিক মাছ যেমন চিনেছি-ঘেঁটেছি সেরকম খেয়েছিও বটে। অবাক হয়ে দেখলাম, যেসব মাছ আড়তে আমরা ফেলে দিতাম, সেগুলোও দিব্বি বহাল তবিয়তে প্লেটে স্থান পেয়েছে, আর তার কি দাম! আমার আরেক ভাই দেখি চিংড়ি ভাজার অর্ডার দিয়েছে, আমিও খাওয়ার জন্য দোকানের পেছনে গেছি হাত ধোওয়ার জন্য, সেখানে যা একটু দুর্দান্ত গন্ধ নাকে আসলো, ভাবলাম আশেপাশে কিছু হয়তো মরে পচে গন্ধ বেরোচ্ছে কিন্তু পরমুহূর্তে আবিষ্কার করলাম মাছের ঝুলি থেকেই এই গন্ধ বেরোচ্ছে। মাছের আঁশটে গন্ধ শেষে হয়ে পচা দুর্গন্ধ ! ভাবা যায়। এমনিতে অফসিজন, তাই সেইসব মাছই চলেছে কয়েকদিন ধরে, আর কদিন পরে হয়তো সেইসব মাছের মিউজিয়ামে ঠাঁই হতো। আর আমি খেলে হয়তো ট্যুরের বাকিদিনগুলো কমোডে বসেই কাটাতে হতো।ভাগ্গিস ফুচকা খাওয়ার জন্য থমকে দাঁড়িয়েছিলাম। মাছ খেতে ইচ্ছে হলে ফ্রেজারগঞ্জ কিংবা স্থানীয় বাজার থেকে টাটকা মাছ কিনে নিয়ে হোটেল দ্বারা রান্না করেই খাওয়াই ভালো(ব্যক্তিগত অভিমত)।

*** পাখা চললেও রুমের মধ্যে ভ্যাপসা গরম। ফোন ঘাঁটবো, তারও উপায় নেই।এখানে বলে রাখি এখানে বিভিন্ন টেলিকম সার্ভিস প্রোভাইডারের নেটওয়ার্ক খুবই দুর্বল।ইন্টারনেট সার্ফিং যেমন খুবই স্লো, কল ড্রপও তেমন স্বাভাবিক ব্যাপার।ATM এর লিঙ্ক মাঝে মাঝেই ফেলিওর থাকে, তাই নগদ টাকা আনাই ভালো। ATM গুলোও বিচ থেকে বেশ অনেকটা দূরে।

New morning new plan: 13th April 2019

কাঁচের শার্সি ভেদ করে রোদ্দুর চোখে পড়তেই আড়মোড়া ভাঙতেই প্রায় 15 মিনিট টাইম লাগিয়ে দিলাম!বাঙালিদের স্বভাব আর কি।প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে সিগারেট নিয়ে ঢুকলাম বাথরুমে! স্বর্গীয় আরাম। যাই হোক, একেবারে স্নান সেরে বেরোলাম পরবর্তী কর্মসূচীর অর্থাৎ ব্রেকফাস্টের জন্য প্রস্তুতি নিতে। বাসস্ট্যান্ডের ঠিক উল্টোদিকেই একটি জলখাবারের দোকান দেখে সেখানেই ঢুকলাম। দেখলাম কাঁচা ছোলা,পেটাই পরোটা, ছোলার ডাল, আলুর দম, ঘুগনি,ডিম সেদ্ধ-পোচ-অমলেট সবই বিক্রি হচ্ছে। অন্যান্য লোকের সাথে আমাদেরও স্থান হলো হোটেলের টেবিলে। প্রথমেই 100 গ্রাম কাঁচাছোলা কিনলাম,দাম 15 টাকা। বেশ লাগলো চিবোতে। তারপরে অর্ডার করলাম পেটাই পরোটা আর ছোলার ডাল । কেউ বা পেটাই পরোটার সাথে আলুর দম-ঘুগনিও অর্ডার করলো।পেটাই পরোটা এখানে ওজনে বিক্রি হয়, দাম 100 গ্রাম 15 টাকা, তরকারি অবশ্য ফ্রি। দেশি ডিমের অমলেট-সেদ্ধ-পোচ 12 টাকা আর পোলট্রির ডিমের সব আইটেম 10 টাকা।খানিকক্ষণ চিবনোর আওয়াজ ছাড়া কিছু শোনা গেলো না। দোকানে বসেই আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম ফ্রেডরিক আইল্যান্ড-হেনরির আইল্যান্ড যাওয়ার কারন ফ্রেজারগঞ্জ মৌসুনি দ্বীপ থেকে আসার সময় তো গেছিই।একে আমরা সব জোয়ান যুবক,তায় এডভেঞ্চারপ্রেমী, সুতরাং আমাদের ট্যুরও যে ব্যতিক্রমধর্মী হবে, সেটা বলাই বাহুল্য।সিদ্ধান্ত হলো ফ্রেডরিক আইল্যান্ড-হেনরির আইল্যান্ড সবাই যেমন গাড়িতে যায়, সেটা আমরা সমুদ্রের পাশ বরাবর ঝাউবন ধরে হেঁটেই যাবো। হেনরির আইল্যান্ডের আগে অবশ্য ছোট্ট একটি খাল/নদী আছে, যেটা ওখানেই সমুদ্রে বিলীয়মান হয়েছে। গুগল ম্যাপের স্যাটেলাইট মোড অন করে বুঝলাম জায়গাটা অগভীর অর্থাৎ ভাঁটা থাকলে সেই জলধারা পায়ে হেঁটেও হয়তো পেরোতেও পারি।অলক্ষ্যে উপরওয়ালার হয়তো সেইসময় আমাদের কথা কর্নগোচর করেছিলেন। প্রত্যেকের ব্যাগে যথেষ্ট পরিমান বিস্কুট-কেক-বাদাম-জল নিয়ে শুরু করলাম হাঁটা ঝাউবন ধরে।

পিকনিকের সময় ঝাউবনের কিছু এলাকা যে রীতিমতো জনপ্রিয় পিকনিক স্পট তার বিভিন্ন চিহ্ন দেখা গেলো। মদের বোতল-প্যাকেটজাত বিভিন্ন খাবারের প্যাকেট অহরহ ছড়িয়ে। খারাপ লাগলো খুব, নির্মল প্রকৃতিকে কলুষিত হতে দেখে।ভাবি মাঝে মাঝে, আমরা প্রকৃতির জীব অথচ প্রতিনিয়ত কিভাবে প্রকৃতির ওপর অত্যাচার করছি। এর প্রতিশোধও যে আমাদের ওপর নেমে আসবে,তা বলাই বাহুল্য। সবার আগে আমাদের দরকার নিজেদের মানসিকতার উন্নতি করার, আর তার সাথে সাথেও প্রশাসনকেও আরো কঠোর হতে হবে।

সমুদ্রকে ডাইনে রেখে আর পশ্চিমবঙ্গ ফরেষ্ট ডিপার্টমেন্টের কুমির-হরিণ প্রকল্পকে বাঁদিকে রেখে এগোচ্ছি হেনরির আইল্যান্ড এর দিকে। বাঁদিকে ঘন জঙ্গল।ঝাউবনের আবহাওয়া বেশ ঠান্ডা আর মনোরম কিন্তু সমুদ্রের পাড়ের আবহাওয়ায় বেশ ভ্যাপসা গরম।মাঝে মাঝে কয়েক জায়গায় শালবল্লী আর লোহার তারের পাঁচিল দেখলাম। কেন পাঁচিল! কারণটা বোধগম্য হলো না। যাই হোক,ক্লান্তবিহীন হাঁটছি। অবশ্য মাঝে মাঝে বিশ্রামও নিচ্ছি, জলপান ও হচ্ছে,খাওয়াও হচ্ছে আর তার সাথে সাথে ধূম্রকুঞ্জেরও যে সৃষ্টি হচ্ছে, সেটা বলাই বাহুল্য। মোবাইলের নেটওয়ার্ক কিন্তু খুবই দুর্বল, তাও মাঝে মাঝে GPS অন করে খুব কষ্ট করে গুগল ম্যাপ দেখে লোকেশন দেখে নিচ্ছি। চলতে চলতে অদ্ভুত একটি জিনিস চোখে পড়লো মাঝে মাঝেই ঝাউবনের বালিতে অনেক পরিত্যক্ত জুতোর আধিক্য।যদিও লোকালয় এখান থেকে যেমন দূর,সমুদ্রও ক্রমশঃ ডানদিকে অল্প করে সরে যাচ্ছে। হয়তো এগুলো সমুদ্রে হারিয়ে যাওয়া জুতো, ভাঁটার সময় ফিরে এসেছে। তারপর প্রচন্ড হাওয়ায়- কিংবা আয়লার মতো ঘূর্ণিঝড়ে বালির ঝড়ের সাথে উড়ে এসে ঝাউবনে আশ্রয় নিয়েছে। জানিনা এর সত্যতা কি!বন বিভাগের বিভিন্ন ছাউনি দেখা গেলো, বেশ সুন্দর, বসার ব্যবস্থাও আছে। চারপাশের ঘন জঙ্গলের মধ্যে অসাধারন একটি নিরিবিলি পরিবেশ। সবার ভালো লাগতে বাধ্য। চলার বিরাম নেই, হাঁটার বিরাম নেই, ফটোশ্যুটেরও বিরাম নেই, সেরকম লোকেশন দেখারও বিরাম নেই আমাদের। জঙ্গল ক্রমশ ঘন হয়ে আসছে। অতজন আমরা থাকা সত্ত্বেও জনমানবহীন পরিবেশে ঘন জঙ্গলের মধ্যে গা একটু যে ছমছম করছে না, তা বলবো না। এতোটা পথ আসলাম, কোনো জায়গায় জনমনিষ্যির বিন্দুমাত্র চিহ্ন দেখলাম না।অজানা আশঙ্কায় চলতে লাগলাম আমরা সবাই।সমুদ্র এখানে ক্রমশ দূরে সরে গেছে, এখানে সমুদ্রতটের একটু দূরেই ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের সমারোহে জায়গাটা যেন জঙ্গলের চেহারা নিয়েছে। ঝাউবন ছেড়ে সমুদ্রতটে দিয়ে আমরা হাঁটছি তখন। সূর্যালোক ক্রমশ তীব্র।তেষ্টাও পেয়েছে, সাথে জল ও প্রায় শেষ।ঘটনাক্রমে একজন বন্ধুর জঙ্গলে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ায় জলের অপচয় সেখানে অনেকটাই ঘটেছে।কিন্তু কি আর করা যাবে, চলতে তো হবেই। দূরের তটভূমি সূর্যালোকে ঠিকমতো ঠাহর করা যায় না, GPS দেখে বুঝলাম সামনেই মোহনা। শুরু হলো নতুন উদ্যমে হাঁটা। সমুদ্র অনেকটাই দূরে,স্রোতের গর্জন যদিও ক্ষীণভাবে কানে আসছে।অবশেষে দেখা অল্পেলাম সেই ক্ষীণ জলধারার, মোহনা ভালোই চওড়া কিন্তু ভাঁটার জন্য জলের আধিক্য খুবই কম। কিন্তু গভীরতা কেমন সেটা আপাতত অজানাই। ঝাউবাগান থেকে একটা লাঠি ভেঙে নিয়ে আসলাম গভীরতা মাপার জন্য।মোহনার কিছুটা বালি তারপরে জলের ধারা, দূরে নদীর পাশে মানগ্রোভের ঘন জঙ্গল। কাদাতে পায়ের ছাপ মানুষের, খানিকটা নিশ্চিন্ত হওয়া গেলো, যে এদিকে মানুষ কদাচিৎ আসে। যাই হোক, বালিতে পা দিতেই পা ঢেবে যেতে লাগলো, অগত্যা পায়ের জুতো হাতে স্থান পেলো। জলের কাছে পৌঁছলাম, মনে অজানা ভয় যে জলের গভীরতা না জানি কত! কুমিরই বা আছে কি না।সবারই মনের চিন্তা একই! পরস্পর পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে থাকলাম। কিন্তু ফিরে যাওয়ার প্রশ্ন নেই, যা থাকে কপালে এই ভেবে লাঠি দিয়ে আগে গভীরতা মেপে এগোতে থাকলাম। একসময় নদী পার করলাম।

সুখের ব্যাপার, নদীর কোনো জায়গায়ই হাঁটুজলের বেশি নেই।একটু দূরেই নদীটি বঙ্গোপসাগরে পড়েছে।তবে আশেপাশের কাদা দেখে বুঝলাম, জোয়ারের সময় এই নদী পার হতে গেলে সাঁতার কেটে কিংবা নৌকোতে পার হতে হত। যদিও আশেপাশে কোনো খেয়াঘাট নেই।

নদীর ওপরেই হালকা ম্যানগ্রোভ জাতীয় উদ্ভিদ।মাটিতে সেইসব উদ্ভিদের শ্বাসমূল ভর্তি। স্থানীয় ভাষায় এই শ্বাসমূলকে “শুলো” বলে। ভয়ঙ্কর কর্দমাক্ত এলাকা আর ঝিনুক ভাঙ্গায় ভর্তি। একবার জুতো পায়ে দিয়ে যা নাকাল হয়েছিলাম বেশি বাহাদুরি করতে গিয়ে জুতো পায়ে ওই ভয়ংকর কাদায় হাঁটা শুরু করতেই জুতো প্রায় এক হাত কাদের তলায়। পা তুলে ফেললাম কিন্তু জুতোর অস্তিত্ত্ব পেলাম না। প্রায় একহাত ঢুকিয়ে প্রানপন শক্তিতে জুতো বের করলাম, যদিও ফিতে খুলে গিয়েছিলো। মাথার ওপর চাঁদিফাটা রোদ। একটু দূরেই ম্যানগ্রোভ কাঁটাগাছের ঝোপ, বেশ ছায়াময় স্থান।ঠিক করলাম ওখানেই কিছু সময় বিশ্রাম নেবো। ভয়ঙ্কর কাঁটাঝোপ চারদিকে, মাটিতেও কাঁটাডাল ভেঙে পড়ে রয়েছে বিভিন্ন জায়গায়।হাতে চটি, তাই কয়েকজনের পায়েও ফুটলো কাঁটা , আমিও তার ব্যতিক্রম নই। ভয়ঙ্কর কাঁটা, ফুটতেই তীব্র যন্ত্রনা।যাই হোক, সেখানেই সাময়িক পানীয় জলবিহীন বিশ্রাম নেওয়া হলো। বিশ্রাম নিয়ে সামনেই হেনরির আইল্যান্ডের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু হলো।অদ্ভুত একটি ব্যাপার দেখলাম, অনেকটা জায়গাজুড়ে কিছু ম্যানগ্রোভ গাছ আছে কিন্তু সেইসব গাছের গোড়ায় কোনো মাটি নেই। গাছের শিকড়ের গঠন স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে অথচ গাছ কিন্তু জীবন্ত ।সেখানেও কিছু ফটোশ্যুট হলো।

Oh my Henry Island: 13th April 2019

কিছু দূরের হেনরির আইল্যান্ডের সমুদ্রবিচে কিছু ট্যুরিস্ট এর আনাগোনা দেখা যাচ্ছে। আমরাও চললাম সেদিকে। মোহনাসংলগ্ন বালিতটে অজস্র লাল কাঁকড়ার ভিড়। মনে হয় মরীচিকা।দূর থেকে দেখছি অথচ সামনে গেলেই অদৃশ্য।মনে হয় লুকোচুরি খেলা চলছে আমাদের সাথে। যেন বলছে, আমাদের পারলে ধরো। অগত্যা চ্যালেঞ্জটি নিল, আমাদের মধ্যে তিনজন। কাঁকড়া তারা বের করেই ছাড়বে। বাকি আমরা কজন এগিয়ে যাচ্ছি একটু দূরেই সমুদ্রতটের দিকে। হঠাৎ পিছনে ফিরে দেখি, তিনজন দৌড়তে দৌড়তে আসছে, মুখে সাফল্যের হাসি! বুঝলাম লাল কাঁকড়া তাদের হাতে ধরাশায়ী হয়েছেন।লালমুখো সাহেবের কয়েকটি ফটো নিয়ে তাকে তার আশ্রয়ে ছেড়ে দেওয়া হলো। আমরা নির্জন সমুদ্রবিচে এসে সবাই মিলে তরঙ্গ উপভোগ করছি। এই বিচের নাম কিরণ বিচ।দূরে কিছু পাখি সমুদ্রতীরে নির্লিপ্তে শিকারের উদ্দেশ্যে দাঁড়িয়ে। লেন্সবন্দি হলো সেটাও।এখানে সমুদ্রে স্নান করা বারণ কারন নাকি চোরাবালির আধিক্য । এর আগেও নাকি কয়েকজন মারাও গিয়েছেন(এগুলি পরে সরকারি সতর্কীকরণ বোর্ড দেখে জেনেছিলাম অবশ্য)। এদিক ওদিক নজর করতেই দূরে একটি ওয়াচ টাওয়ারের দেখা পেলাম। 2013 তে যখন এসেছিলাম তখন এসব অবশ্য দেখিনি।এদিকে পেটে ছুঁচোও ডনবৈঠক ভাঁজছেন আর শরীরেও H2O এর তীব্রভাবে প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। অগত্যা চললাম ওয়াচ টাওয়ারের পানে। কাছেই একটা নলকূপ, প্রানভরে জলপান করে প্রাণ যেন ফিরে পেলাম। ওয়াচ টাওয়ারের গায়ে লেখা আছে টিকিট 5 টাকা। কিন্তু টিকিট কাউন্টার কোথায়! সামনের বেঞ্চে দুজন সিভিক ভলান্টিয়ার কর্মী উপবিষ্ট। তাঁদের জিজ্ঞাসা করতেই তারা বললেন টিকিট দেওয়ার লোক উপরেই আছেন। চারপাশে ম্যানগ্রোভের জঙ্গল আর কাঁটাঝোপ, সামনে বে অফ বেঙ্গল। হাওয়া আসছিলো কিন্তু সেটা গরম কমাচ্ছিলো না।ক্লান্ত অবস্থায় কেউ আর সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠতে চাইছিলো না। তাও পকেট থেকে 5 টাকার কয়েন বার করে আমিই উঠলাম ওয়াচ টাওয়ারের মাথায়। ভাবলাম, এত কষ্ট যখন করেছি, এটাই বা মিস থাকে কেন!

ওয়াচ টাওয়ারটি তিনতলা। সিঁড়ি ভেঙে তিনতলায় উঠে মনে হলো AC ঘরে আসলাম। অনাবিল ঠান্ডা বাতাস, শরীর যেন জুড়িয়ে গেলো। সামনে সমুদ্র !আহা কি দৃশ্য!

আমার আরামের হাঁকডাক শুনে আরো কয়েকজন দেখি আমার আরামে ভাগ বসাতে আসলেন। ওয়াচ টাওয়ারের কর্মীর সাথে একটু আলাপ করলাম, আমাদের মতোই বয়সের। বললো আয়লায় এই অঞ্চলের বৈশিষ্ট অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছে। আগে ঝাউবন আরো সামনে ছিলো, আয়লায় সেইসব ধ্বংস হয়ে আজকের অবস্থায় এসেছে। আমরা বকখালি থেকে হেঁটে এসেছি শুনে তাঁর চোখ কপালে উঠলো। বললো এর আগে এরকম কাউকে হেঁটে আসতে দেখেনি। সবাই বেশ একটু আত্মতৃপ্তই হলুম।ম্যাপ দেখে বুঝলাম সামনেই একটি বড়ো মোহনা,তারপরেই লোথিয়ান দ্বীপ। তার পেছনেই শ্রীমান দক্ষিণ রায়ের আবাস।চারপাশে ম্যানগ্রোভ ঘন অরণ্যের মাঝে দক্ষিণ রায়ের স্মরনে যেন একটু ভয়ংকর রোমাঞ্চ অনুভব করলাম। সহসা পাকস্থলীর ডাকে স্মরনে আসলো যে, বায়ুসেবন পেটের ক্ষুধা নিবৃত্তিতে বিন্দুমাত্র ভূমিকা রাখে না।হোটেলের কথা চিন্তা করতেই মনে পড়লো আগেরবার যখন হেনরির আইল্যান্ড এসেছিলাম, তখন এখানেই স্টেট ফিশারিজ এর দুটো মৎসচাষকেন্দ্র কাম হোটেল আছে। একটির নাম সুন্দরী কমপ্লেক্স আর একটি ম্যানগ্রোভ কমপ্লেক্স।ওয়াচ টাওয়ার থেকেই 10 মিনিটের হাঁটাপথেই সুন্দরী কমপ্লেক্স।সেখানে আগে থেকে বুক করলে দুপুরের মিলও পাওয়া যায় এবং এখানকার খাবারও শুনেছি সুস্বাদু।বেশি দেরি করলে অবশ্য বুক করা যায় না।। সুতরাং বিন্দুমাত্র দেরি করলাম না আমরা! সাধের প্রাকৃতিক AC ফেলে ছুটলাম সুন্দরী কমপ্লেক্সের উদ্দেশ্যে।দেখলাম রাস্তাটি সুন্দর পাকা হয়েছে।ম্যানগ্রোভ অরণ্যের মাঝে সুন্দর একটি কাঠের ব্রিজও রয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় পর্যটকদের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন সতর্কীকরণ বোর্ড ও রয়েছে। দেখে ভালো লাগলো।কিছুটা হাঁটতেই দুপাশে অজস্র মাছচাষের পুকুর নজরে আসলো। অদূরে অনেক বাংলোটাইপের ঘর দেখতে পেলাম। অনেক ট্যুরিস্টও দেখলাম। মূলত যারা নিরিবিলিতে সুস্বাদু টাটকা খাবারের সঙ্গে থাকতে পারেন, তাদের জন্যই এই বাংলোগুলো। আশেপাশে অনেক গাড়ি পার্ক করা, টোটোও পার্ক করা। তারা সব রিজার্ভ পর্যটকদের নিয়ে এসেছে।বলে রাখা ভালো, বকখালি থেকে টোটো-গাড়ি বুক করলে সেটা এই পর্যন্তই আসে।এখান থেকে নেমে বাকি সামান্য পথ হেঁটেই হেনরি আইল্যান্ড বিচে যেতে হয়।এখানেও একটি ওয়াচ টাওয়ারও আছে। মূল্য 5 টাকাই।সেই সময় উঠলাম না, ভাবলাম আগে তো মিল বুক করে আসি। একটু দূরেই বাঁধানো একটি বড়ো টবে সুন্দরবনের বিখ্যাত সুন্দরী গাছ। কমপ্লেক্স অফিসে দেখি অনেক ট্যুরিস্টদের ভিড়। তারাও আমাদের মতো একই উদ্দেশ্যে।

Time to Eat: 13th April 2019 (01:00 P.M.)

অফিস ফাঁকা হলে তিনজন ভিতরে ঢুকলাম আমাদের দাবি জানাতে। ওনাদের মধ্যে একজন বললেন এখন খুব চাপ,আলাদা আলাদা কিছু মিল নেওয়া সম্ভব হবে না! যা মিল নিতে হবে সেটা 11 জনেরই একই নিতে হবে। তখন আমাদের সবার খিদের মুখে তখন তাই-ই সই। ভাবছি, চিকেন মিল নেবো নাকি পোনা মাছের মিল(এখানে পোনা মানে এদের ভাষায় রুই অথবা কাতলা! আমরা রুই পেলাম, দাম একই)। বাইরে তৎক্ষণাৎ আমাদের গুরুগম্ভীর বেঞ্চ বৈঠক বসলো, শেষে সিদ্ধান্ত হলো পোনা মিলই নেওয়া হবে। এখানে বলে রাখি বকখালির হোটেলের থেকে দাম একটু বেশি কিন্তু খাবার খুব সুস্বাদু।মাথাপিছু পড়লো 5% GST নিয়ে 130 টাকার মতো প্রায়। যাই হোক, পেটপুজোর আয়োজন সমাধা করে গাছতলায় বসলাম। ওনাদের একটি স্ন্যাক্স এর কাউন্টার আছে। চা,কফি,ঠান্ডা জল পাওয়া যায়। কফি GST নিয়ে 11 টাকা পড়লো আর ঠান্ডা বিসলেরি 2 লিটার এর বোতল 40 টাকা। প্রাণ ঠান্ডা করে মাছভাতের অপেক্ষায় রইলাম। আমাদের বললো 01.30 এর পরে খাবার পরিবেশন হবে।আড্ডা মেরে,গল্প করে,পরবর্তী ট্যুর কোথায় করা যায় এই নিয়ে আমরাও সময় কাটাবার তালে রইলাম।

অদূরেই তিনজন সুবেশা তন্বী কিশোরী চেয়ারে উপবিষ্ট হয়ে আমাদের মত আড্ডা মারছিলো।আমাদের অনেকেই আড়চোখে তাঁদের হয়তো নিজেদের গার্লফ্রেন্ডরূপে কল্পনা করছিলো, অবশ্য আমিও যে এর ব্যতিক্রম নই, তা বলবো না।

সাত মিনিট লেট করে 01.37 এ আমাদের ডাক পড়লো। কিচেন রুমে ঢুকলাম, বেশ পরিষ্কার পরিছন্ন। বেসিনে হাত ধুয়ে চেয়ার দখল করে বসলাম, দেখলাম আরো কয়েকজনের একই প্রয়োজন হেতু আগমন ঘটলো। ফাইবারের প্লেট দেওয়া হলো,টেবিলের মাঝে ছিলো জগ!অবশ্য কেউ কাঁচের গ্লাসে জল খেতে চাইলেও তারও ব্যবস্থা আছে। সেই কোন সকালে বেরিয়েছি, তাই খাবার দিতে যখন কিঞ্চিৎ দেরি হলো,তাতে আমাদের ব্রহ্মতালু যেন আরো জ্বলে উঠলো ক্ষুধাগ্নিতে।মনে হলো, আজ খিদের চোটে প্লেট-চেয়ার-টেবিল যেন না খেয়ে ফেলি। খানিক্ষণ পরে চোখের সামনে যে খাদ্যবস্তুসমন্বিত যে প্লেটটির আগমন ঘটলো, তা যেন আমাদের অনেকেরই অতিপ্রিয় একটি ডিশ। সরু চালের ভাত,মুগ ডাল,সরু করে আলু ভাজা আর একটি সিজনাল সবজি, সাথে একটুকরো লেবু,পেঁয়াজ আর কাঁচালঙ্কা।কারো মুখে কোনো কথা নেই, গোগ্রাসে সেই সুস্বাদু খাবার গিলতে লাগলাম।অবশ্য খাওয়ার আগে একটি ছবিও তুলে নিয়েছিলাম। অসাধারণ টেষ্ট ছিলো প্রতিটি পদের, পুরো যেন মায়ের হাতের রান্না। কতবার যে ডাল,ভাত,সবজি নিয়েছিলো তার ইয়ত্তা নেই। মাছ আসলো, বেশ বড় পিস, দারুন সুস্বাদু।শেষপাতে চাটনি আর একটুকরো পাঁপড়ের সহযোগে অবশেষে আমাদের ব্রহ্মতালু ঠান্ডা হলো। আমাদের টেবিলের খাওয়াতে এতই সময় লেগেছিলো যে, অনেকেই তাঁদের মধ্যে দু-দুবার খাওয়া শেষ করতে পারতেন। যাই হোক কে কি ভাবলো তাতে আমাদের থোড়াই কেয়ার।খিদে পেয়েছে, পেটভরে খেয়েছি ব্যস।

Back to Pavilion : 13th April 2019 (04:00 P.M.)

উদরপূর্তির পরে ঠান্ডা স্নিগ্ধ গাছতলায় এসে বিশ্রাম করছি, হাত-পা যেন ভেঙেচুরে আসছে। হোটেলের বিছানার কথা বড্ড মনে হচ্ছিলো, বিছানাটাই যেন এখন স্বর্গ। কিন্তু এসব ভাবলে তো আর চলবে না,হোটেলে ফিরতেই হবে। কিন্তু যেসব গাড়ি-টোটো আছে সেগুলো তো রিজার্ভ। আর এতটা পথ হেঁটে গেলে এখন আর আমাদের দেখতে হবে না।যিনি আমাদের মিলের অর্ডার নিয়েছিলেন,তাঁর সাথে যোগাযোগ করলাম, তিনিই শেষপর্যন্ত ফোন করে একজন দুজন টোটোওয়ালার ব্যবস্থা করলেন। তখন ভাড়া নিলো মাথাপিছু 25 টাকা। সুন্দরী কমপ্লেক্সকে বিদায় জানিয়ে সামনের ম্যানগ্রোভ কমপ্লেক্সের পাশ দিয়ে জঙ্গলঘেরা নির্জন রাস্তা পেরিয়ে আমরা অবশেষে হোটেলে এসে ঢুকলাম। সময় তখন 04.09। হোটেল বুক আমাদের দুদিনের জন্যই অর্থাৎ কাল সকালেই চেক আউট। হঠাৎ মনে পড়লো, বকখালি কুমির আর হরিণ প্রকল্পই তো দেখা হলো না।বাসস্ট্যান্ডের পাশেই এই প্রকল্প। যুদ্ধকালীন ভাবেই আবার কাকস্নান সেরেই হাজির হলাম কুমির প্রকল্পের টিকিটঘরে । টিকিটের মূল্য 10 টাকা।দুপাশে ঘন জঙ্গলের মাঝে রাস্তা, কিছুটা এগোতেই ডানদিকে দেখলাম কয়েকটা ডোবা। সেখানেই দেখি কুমিরবাবাজিরা ডোবার পাড়ে নির্লিপ্তভাবে শুয়ে আছেন।জলে কয়েকটি মরা মাছ ভাসছে,পচা গন্ধ নাকে ঝাপটা দিচ্ছে। পাশেই বিরাট একটি জায়গায় অনেক চিতল হরিণের বাস। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকটি শিঙেল হরিণও আছে। কিছুক্ষন খিঁচিক খিঁচিক করে ফটোশ্যুট হলো।আর দেখার কিছু নেই, বেশ কয়েকটি বসার স্থান।বেশ আড্ডা মারা যায় সবাই মিলে। দূরে তাকাতেই দেখলাম একটি গেট। কৌতূহলভরে এগিয়ে গেলাম সেদিকে, দেখি অনেক ট্যুরিস্টই আছেন। সেখানে চারপাশের ঘন ম্যানগ্রোভ জঙ্গল, তারই মাঝে গাছ কেটে রাস্তা বানানো হয়েছে। গাছের ছবি ও নাম সম্বলিত বিভিন্ন বোর্ড দেখলাম।যাতে পর্যটকরা সহজেই এইসব গাছের সাথে পরিচিত হতে পারেন। জঙ্গলটিকে ট্যুরিস্ট স্পট বানানোর কাজ চলছে অনেকটা এলাকা জুড়ে। ছোট্ট একটা খাল ও কাটা হয়েছে, তাতে কিছু ছোট মাছের বাচ্চা কিলবিল ও করছে। দূরে একটি শালকাঠের তৈরি ওয়াচ টাওয়ার, তার পাশেই একটি সাঁকো সেই মনুষ্যসৃষ্ট নালাটির ওপর। বেশ DP তোলার জায়গায়। ওয়াচ টাওয়ারের অনেকগুলো তলা। ওপরের তলায় উঠলে আশেপাশে জঙ্গলের গভীরতা সম্পর্কে যেমন বেশ আভাস পাওয়া যায়,তেমন সুন্দরবনের পরিবেশ সম্পর্কেও অনেকটাই ধারণা করা যায়।তাছাড়া কুমির প্রকল্পের গেটের বাইরে বাঁদিকে হোটেলগুলো দেখলে মনে হয় না পেছনেই আছে ঘন ম্যানগ্রোভ অরণ্য। একসময় হয়তো পুরোটাই জঙ্গল ছিলো, ক্রমশ জঙ্গল কেটে বসতি স্থাপন করা হয়েছে।
কুমির প্রকল্পের গেট দিয়ে যখন বাইরে বেরোলাম তখন সন্ধ্যা 06.20। মূল গেট বন্ধ হয়ে গেছে, পাশের একটি ছোট্ট গেট দিয়েই বাসস্ট্যান্ডে আসলাম। হালকা খিদেও যে পায়নি, সেটা বলাই বাহুল্য।বাসস্ট্যান্ডের পাশের একজন মহিলার ফুচকার দোকান।এখানে ফুচকা 10 টাকায় 8 টা, সাইজও ভীষন বড়ো, এক কামড়ে খাওয়া প্রায় দুঃসাধ্য। প্রায় 20 টাকার ফুচকা খেয়ে চলে গেল উল্টোদিকের মুরগির দোকানে, যদিও এই দোকানে প্রায় সবই পাওয়া যায়। পোল্ট্রি মুরগির মাংস এখানে 200 টাকা কেজি। আমাদের মধ্যে অনেকেই রাতে হোটেলে ভেজ মিল খাবে তাই আমরা 4 জন 1 কেজি মাংস নিলাম। সাথে 500 আলু কিনে সকালের যে হোটেলে টিফিন করেছিলাম সেখানে উপস্থিত হলাম। সেই হোটেলে এখন চপ-পেঁয়াজি-ছোলাসিদ্ধ বিক্রি হচ্ছে।ওনারা মাছ-মাংস দিলে আবার রান্নাও করে দেন। এক্ষেত্রে রান্নার রেট হলো এক কেজি মাছ/মাংস রান্না করে দিলে 100 টাকা নেবে।রাত 9টায় মাংস নেব বলে আসলাম। কেউ তখন হোটেলে ফিরলো আর কেউ গেলো বিচে। আমি হোটেলে ফিরে স্নান করে এক ঘুম লাগালাম।ক্লান্তিতে শোয়ার কিছুক্ষন পরেই দু চোখের পাতাজুড়ে নেমে আসলো সাধের ঘুম। ঘুম ভাঙলো রাত্রি 09.15 তে দরজায় ঠকঠক শব্দে। দেখলাম অন্য পার্টনাররা রুটি আর মাংস নিয়ে হাজির। পেঁয়াজ লঙ্কা সহযোগে সেই রাতে খাওয়াটা কিন্তু অসাধারণ হয়েছিলো।খেয়েই ঘুম লাগলাম। চেক আউট যেহেতু 11 টায়, তাই ব্যাগ গোছাবার যথেষ্ট সময় আছে ভেবে ঘুমিয়ে পড়লাম।

Its time for home: 14th April 2019 

পরদিন উঠে সিগারেট সহযোগে অসাধারণ আরামের প্রকৃতির ডাকের সাড়া দেওয়ার নিয়মের কোনো ব্যতিক্রম হলো না ।ফ্রেশ হয়ে অতঃপর শুরু হলো ব্যাগ গোছানো।হাতে সময় রয়েছে, তাই ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়লাম পেটাই পরোটার টানে, কিন্তু পরক্ষনেই সিদ্ধান্তবদল। দুপুর 12.28 এ ট্রেন, বাড়ি যেতে যেতে তাও বিকেল হয় যাবে। তাই সবাই ভাত খাওয়াই মনস্থির করলাম।কেউ ভেজ মিল নিলো, আবার কেউ ডিম মিলের অর্ডার দিলো। ভাত-ডাল-কালকের সবজি(সবজি গরম করলেও তখনও ফ্রিজের বরফঠান্ডার আভাস পাচ্ছিলাম)-ডিম-কালকের চাটনি দিয়ে পেটভরে খেয়ে আসলাম বাসস্ট্যান্ডে। ভাবলাম বাসে যাবো, ভাড়া 22 টাকা। কিন্তু বাসে অনেকেরই উল্টির প্রবেলম, আমারও! তায় আবার থেমে থেমে প্রায় 45 মিনিটের জার্নি। বাস ত্যাগ করে বড় পাটাতনের ইঞ্জিনভ্যানের খোঁজ করতে লাগলাম, দু-একটি মিললেও কেউ যেতে চাইলো না।শেষমেষ আমাদের ভাগ্যের সহায় হলো টোটো। দুটো টোটো একেবারে নামখানা স্টেশন পর্যন্ত রিজার্ভ করা হলো, ভাড়া পড়লো টোটোপিছু 350 টাকা। তাও অন্তত শান্তি যে, সুন্দর ফুরফুরে হাওয়ায় রিল্যাক্সে যাওয়া যাবে। ইঞ্জিনভ্যানে যদি যেতাম, নামখানা স্টেশনে পৌঁছে মাথায় ডিম ভাঙলে আমি শিওর সেটা অমলেট হয়ে যেতো।
টোটো বুক করে হোটেল থেকে ব্যাগ নিয়ে আসার সময় হোটেলের একজনকে ডেকে নিয়ে আসলাম চেক আউটের পূর্বে হোটেলের রুম দেখে নিতে।

তিনি পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে সব চেক করলেন, পারলে সিমেন্টের খাটও মনে হয় তুলে চেক করে যে আমরা সেই খাট ভেঙেছি নাকি!বুঝুন কান্ড, আমরা তো আর কাপল নই! আমরা নিরীহ ব্যাচেলর মানুষ, তাহলে খাট ভাঙার প্রশ্ন আসছে কোত্থেকে????

টোটো 12 নং ন্যাশনাল হাইওয়ে ধরে মসৃন ভাবে চলছে, আমাদের প্রায় সবার দু আঙুলের ফাঁকে ফ্লেক শোভা পাচ্ছে, সাথে সৃষ্টি হচ্ছে ধূম্রকুঞ্জ। আমাদের ব্লুটুথ স্পিকারের গানের তালে,ফুরফুরে হাওয়ায় কখন যে দুচোখের পাতা বুঝে এসেছে, তা নিজেদেরই খেয়াল নেই।ঘুম ভাঙলো টোটোর তীব্র ক্যাঁচকোচ শব্দে, চোখ খুলে দেখলাম টোটো ব্রিজে উঠছে। আমাদের পাহাড়প্রমান বপুর ভার সামলাতে তিনিও যেন তাঁর সর্বশক্তিব্যয় করেছেন।কিছুক্ষন পরেই ঢুকলাম নামখানা।স্টেশনে, তখনও ট্রেন আসেনি। টোটোতে থাকার সময়ই অবশ্য UTS APPS এ অশোকনগর পর্যন্ত টিকিট কেটে নিয়েছিলাম, ভাড়া 35 টাকা। একটু পরে ট্রেন ঢুকতেই রানিং এ উঠে জানলার পাশের সিটগুলো আমাদের দ্বারা দখলকৃত হলো। ট্রেন যথাসময়ে ছাড়লো, ফাঁকাই ট্রেন।সবুজ প্রকৃতিসহ অজস্র পুকুর-নালা পেরিয়ে ট্রেন ছুটলো শিয়ালদহ এর উদ্দেশ্যে। লক্ষীকান্তপুরে এসে ট্রেন অনেকসময় থামলো, বলে রাখি নামখানা-লক্ষীকান্তপুর সিঙ্গল লাইন সেকশন।কিছুক্ষন পরে আবার ট্রেন চলতে শুরু করলো। বলা বাহুল্য, ট্রেনে ওঠার পর আমাদেরও খাওয়ার কোনো বিরাম নেই। তা সে, কাঁচাছোলাই হোক বা তিলের নাড়ু কিংবা আম পোড়ার শরবতই হোক না কেন। নিদ্রাদেবীও এখানেও আমাদের পিছু ছাড়লো না। ঘুম ভেঙে দেখি জানলার পাশে মেট্রো দেখা যায় যেন! চোখ কচলে দেখলাম সত্যিই তাই। স্টেশনবোর্ডে তখন গড়িয়া এর নাম জ্বলজ্বল করছে। ট্রেন ছেড়ে দেওয়ার সময় মনে হয় এই ভ্যাপসা গরমে যদি গড়িয়া স্টেশনে নেমে AC মেট্রো ধরে নিলে খুবই উত্তম হতো। কিন্তু আমাদের ট্রেনের চাকা যখন গড়াতে শুরু করেছে, তখন আর হাত কামড়ে লাভ নেই। হঠাৎ মনে হলো, ক্যানিং থেকে বারাসাত যাওয়ার একটি ট্রেনের কথা।NTES এ ট্র্যাক করেই দেখলাম সেটা আমাদের পেছন পেছনেই আসছে। সবাই শিয়ালদহ এর অফিসটাইমের ভিড় এড়াবার জন্য পার্ক সার্কাসে নেমে ওই ট্রেন ধরার জন্য মনস্থির করলাম। পার্ক সার্কাস স্টেশন নেমেই ওভারব্রিজে ওঠেই ওপরের নং প্ল্যাটফর্মে গিয়েই দেখলাম আমাদের ট্রেন ঢুকছে।নতুন ঝকঝকে Bombardier রেক পেলাম, (প্রথামবস্থায় এই রেকগুলোকে অনেকে AC- রেক বলতো)। অবশেষে নামলাম বারাসাত। আমাদের ট্রেন অনেক দেরি তখন। 05.40 এর বারাসাত বনগাঁ ধরবো।ভ্যাপসা গরমও পড়েছিলো খুব, সবাই একটু ফ্রেশ হয়েই 4 এবং 5 নং প্ল্যাটফর্মের মাথায় বনগাঁর দিকে চলে আসলাম। প্ল্যাটফর্ম ছেড়েই একটু দূরেই ঘাসে আচ্ছাদন রয়েছে, সবাই সেখানেই চলে আসলাম।জনকোলাহলহীন এখানে ফুরফুরে হাওয়ায় বেশ আরামই লাগলো। ও বাবা! লটবহর শুদ্ধ আমাদের 11 জনকে বসতে দেখে চাওয়ালা-ঘটিগরমওয়ালা আর কুলফিওয়ালাও গুটিগুটি পায়ে আমাদের পাশে চলে আসলেন। যাই হোক,কাউকেই নিরাশ হতে হলো না।
খেতে খেতে পরবর্তী ট্যুরের গন্তব্যস্থল সম্পর্কে বিভিন্ন আলোচনা হতে থাকলো।কেউ বললো মেঘালয়, কেউ বললো সুন্দরবন।শেষমেষ বাবা দক্ষিণ রায় আর মাতা বনবিবির আশীর্বাদই হয়তো আমাদের মাথায় স্থান পেলো। যাই হোক সেটা হয়তো ভবিষ্যতই বলবে। কারশেড থেকে তখন বারাসাত বনগাঁ লোকাল 5 নং প্লাটফর্মে ঢুকছে। রেডি হলাম যে যার গৃহপানের দিকে।