“উড়ালি বিড়ালি বাওয়ে নাওয়ের বাদাম নড়ে,
আথালি পাথালি পানি ছলাৎ ছলাৎ করে রে..
আরে খল খলাইয়া হাইসা উঠে
বৈঠার হাতল চাইয়া হাসে, বৈঠার হাতল চাইয়া…
নাও ছাড়িয়া দে পাল উড়াইয়া দে
ছল ছলাইয়া চলুক রে নাও মাঝ দইরা দিয়া চলুক মাঝ দইরা দিয়া…”

Wayanad , Kerala

তবে এ কেমন নাও বাপু? না আছে নাও এর বাদাম, না আছে তার গলুই, বৈঠাই বা তার কেমন ধারা? আর ওই যে দেহাতী মানুষ টি ক’খানি বাঁশ লম্বালম্বি আড়াআড়ি একসাথে বেঁধে মাঝ দরিয়ায় ভাসছে তাকেই কি আর ‘নাইয়া’ বলা চলে? 

ধুস! মন কবে এসব ব্যাকরণ মেনেছে? সে তো শুধু ভেসে যাওয়ার মাধ্যম খোঁজে…!
আগের দিন সন্ধ্যে নেমে আসছে যখন পাহাড় ছুঁয়ে হ্রদের অতল জলে, আশমান আর দরিয়া মেখে নিচ্ছে শেষ রং টুকু, তখন ই দেখেছিলাম, ছায়া ঘনিয়ে আসা জলের বুকে একরত্তি এক ভেলায় চড়ে ঘরে ফিরছে এক ছায়ামানুষ, ওই ওপারে কোনো এক সবুজচরে বোধহয় তার বসতি, বাঁশের ভেলায় টিমটিম করে জ্বলছে কুপি, জেলেমাঝি মাছ শিকারের পর ফিরছে ঘরে। তক্ষুনি ইচ্ছেরা আশকারা দিয়ে উঠেছিলো…টিকিট কেটে বোটিং নয়,নিদেন ভাড়া করা নৌকা ও নয়, এক প্রান্তিক জেলের নগন্য এক বাঁশের ভেলায় চড়ে ছুঁয়ে আসতে ইচ্ছে করছিলো ওই রহস্যময় দ্বীপ গুলো, ওই ওপারের ধীবরপল্লী গুলো…
কিন্তু তখন রাত নেমেছে মহাসমারোহে,নিকষ কালো অন্ধকারে ঝিমোচ্ছে চারপাশ…ভোরের অপেক্ষায় রইলাম, সকালে উঠে খোঁজ করবো ধীবরমাঝির , সওয়ার হবো তার একফালি নাও এ।
পরদিন, ভোর অবশ্য লাল টুকটুকে বেশে এলোনা, এলো বৈরাগীর বেশে, ধূসর পোশাকে সর্বাঙ্গ ঢেকে…কুয়াশারা যে যেখানে ছিলো, এসে ভিড় করতে লাগলো জলের বুকে, ঘাসের ডগায়, পাহাড়ের খাঁজে…এমনকি তেজী সূর্য টাকেও নাস্তানাবুদ করে তুললো, যেন কুয়াশা সাম্রাজ্যে দিশেহারা সে…
তিন মালয়লি কিশোর খড়কুটো জড়ো করে আগুন জ্বালানোর চেষ্টা করছে, শিশিরে ভিজে চুপ ঘাসপাতারা…
ওদের কেই জিজ্ঞাসা করলাম “মাঝি কে দেখেছো তোমরা?ওই যে ওপারে থাকে, বাঁশের ভেলায় চড়ে যে মাছ শিকারে যায়?” যথারীতি ওরা আমার ভাষা বুঝলো না,আর আমরা ও বুঝলাম না ওদের ভাষা…ব্যাম্বু র‍্যাফ্ট কে মালয়ালম ভাষায় কি যে বলে ছাই,জেনে নেওয়া উচিত ছিলো…. !
হঠাৎ দূরে ছোট্ট একটা বিন্দুর মত আবির্ভুত হতে লাগলো সেই ছায়া মানুষ…যেন শিশুর আনকোরা হাতে আঁকা জলছবি.. মেঘ আর কুয়াশার পর্দা ভেদ করে নরম হলদে আলোয় ছেয়ে যেতে লাগলো আশপাশ….
ছলাৎছলাৎ শব্দ করতে করতে এসে ভেলাটি কে আমাদের সামনেই নোঙর করলেন মাঝি,আমি হড়বড় করে তাকে বলতে লাগলাম ‘নিয়ে যাবে গো আমায় ?’ ধীরস্থির লোকটি বুঝলেন না ভাষা, তবে ইচ্ছে টা ধরতে পারলেন…ঘাড় নেড়ে সম্মতি দিলেন….
ওদিকে মেঘ আর কুয়াশারা তখন ধীরে ধীরে পিছু হঠতে শুরু করেছে, সকালও বৈরাগ্যের পোশাক ছেড়ে নীলরাংতা জড়ানো ঝলমলে বেশে সেজে উঠতে লাগলো….ভালোলাগার ঝুলি ভরে নিয়ে, ফিরে এলাম ঘাটের কাছে..
যদিও একটি ও পয়সা নিতে রাজি হচ্ছিলেন না, জোর করে হাতে কিছু দিলাম, এই একরাশ মুগ্ধতার বিনিময়ে যদিও তা কিছুই নয়… 
অবশ্য ,আমাদের মুগ্ধতা ওনার কাছে কেবলই প্রাত্যহিকতা, আপনমনে হাতের লগি টা শক্ত করে ধরে বাঁশের ভেলা নিয়ে পাড়ি দিলেন রুটিরুজির সন্ধানে,অন্য কোনো ঘাটে নাও ভিড়াতে… 
জলের কিনার ঘেষে দাঁড়িয়ে আমরা দেখতে থাকি-

“ভেসে যায় আদরের নৌকো , ভেসে যায় সোহাগের সাম্পান…”