আমরা বেড়াতে গিয়ে নানারকম কিছু দেখি, শিখি, জানতে পারি। এও সেরকম হাতের কাছের এক অজানাকে আরো একটু ভালো করে জেনে নেওয়ার ও জানাবার প্রয়াস। বাবুই পাখি, ছোটোবেলায় বইতে পড়েছি এরা খুব সুন্দর করে বাসা বানায়। কিছু ছবিও দেখেছি বইয়ের পাতায়। আজ দু-কথা এই বাবুই পাখিদের নিয়েই….

এইরকম ছোট্ট একটা পাখি, ততোধিক ছোট্ট তাদের মস্তিষ্ক। কিন্তু এদের বুদ্ধির তারিফ না করে সত্যিই থাকা যায় না। বাবুই পাখি যে বাসাটি বানায়, তা সত্যিই অত্যান্ত উন্নত ইঞ্জিনিয়ারিং এর নিদর্শন। এই পাখি সর্বদাই ঝুলন্ত বাসা বানায়, এ আমরা সবাই জানি। কিন্তু এরা সর্বদাই বাসা বানায় গাছের নীচের দিকের ডালগুলোর সাথে। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে যে এরা বাসা বানাবার জন্য গাছের এমন ডালগুলোকে বেছে নেয় যা কোনো জলাশয়ের ওপরে হেলে পড়েছে। এর কারণ একটাই, তা হলো বাজ, ঈগল জাতীয় পাখিদের থেকে নিজেদের এবং নিজের বাচ্চাদেরকে রক্ষা করা। এই ধরণের নীচু ডাল থেকে ঈগলজাতীয় পাখিরা এদের ছোঁ মেরে নিয়ে যেতে পারে না। আমরা জানি বাবুই পাখি সারা বছরই দল বেঁধে ঘোরাফেরা করে। কিন্তু এই সময়টাতে, বর্ষার শুরুতে দলের প্রতিটি প্রজননক্ষম পুরুষ পাখি আলাদা আলাদা করে নিজের নিজের বাসা বানানো শুরু করে দেয়, উদ্দেশ্য বংশবৃদ্ধি। কিন্তু আলাদা আলাদা বাসা বানালেও এরা সাধারণতঃ একটি জায়গাতেই আশেপাশেই বাসা বানায়। বেশীরভাগ সময়েই এটা লক্ষ করা যায় যে, এরা গাছের পূর্বদিকে অবস্থিত ডালে বাসা বানায়। বিজ্ঞানীরা মনে করেন এদের পূর্বদিকে বাসা বানানোর কারণ হলো বর্ষার সময়ে পশ্চিমী ঝঞ্ঝার থেকে নিজের বাসাকে রক্ষা করা। কিন্তু কী করে এরা এদের অতিক্ষুদ্র মস্তিষ্ক দিয়ে দিক নির্ণয় করে তা সত্যিই এক আশ্চর্য্য ব্যাপার। অবশ্য জীবজগতে এরকম অনেকই অবাক হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা লক্ষ্য করা যায় প্রায় সব পশুপাখীর মধ্যেই। বাবুই পাখি টিয়া, কাকাতুয়ার মতোই ভালো পোষ মানে এবং তালিম দিলে এরা তা অত্যান্ত দক্ষভাবে অনুসরণ করে। ছোটোবেলায় অনেক সার্কাসেই এদের দেখা যেতো প্রশিক্ষকের ইশারাতে খেলনা কামান, সাইকেল ইত্যাদি চালাতে। আজকাল আইন কানুন করে এদের ধরা এবং পোষা বন্ধ হয়েছে। বাবুই পাখি বাসা বানায় ঘাসের বা ধানগাছের লম্বা পাতার ফালি দিয়ে এবং তা পুরুষ পাখিরা নিজে উড়ে গিয়ে তীক্ষ্ণ ঠোঁট দিয়ে সেই পাতা চিরে নিয়ে আসে। এ ব্যাপারে অক্লান্ত পরিশ্রম করে পুরুষেরা। বাসা বানানোর সময়ে, অন্য পাখির অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে পাশের বাসা থেকে ঘাসের ফালি চুরিও করে এরা। আবার এই চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে গেলে, দুই পুরুষের মধ্যে যুদ্ধও বেঁধে যায়। পুরুষ পাখিরা অর্ধেক বাসা তৈরী করার পর থেকেই বাসার ওপরে বসে নিজের সুন্দর ডানাদুটো বারবার ঝাপটাতে থাকে আর ডাকতে থাকে স্ত্রী পাখিকে আকৃষ্ট করার জন্যে। কোনো স্ত্রী পাখি আকৃষ্ট হলে তারা জুটি বাঁধে এবং তখন স্ত্রী পাখিটিও পুরুষটির সাথে বাসার বাকী অংশ বানাতে থাকে। ঘাস দিয়ে বাসা বানানো শেষ হয়ে গেলে, পুরুষ পাখি মুখে করে কাদার তাল বা গোবর নিয়ে আসে এবং স্ত্রী পাখিটি সুন্দর করে সেগুলো বাসার গোলাকার অংশে লেপতে থাকে। বাবুই পাখি এটা করে জোরালো হাওয়া এবং বৃষ্টি থেকে নিজের ডিম ও বাচ্চাদের রক্ষা করার জন্যে। কিছু লোককথায় কথিত আছে এরা জোনাকী পোকা ধরে এনে বাসার ভিতরে নরম কাদার মধ্যে গেঁথে রাখে, যা তাদের বাসাকে আলোকিত রাখে। কিন্তু সেরকম কিছুর প্রমাণ এখনো পাওয়া যায় নি। একটি স্ত্রী পাখি দুটো থেকে চারটে পর্য্যন্ত ডিম পাড়ে এবং তা তারা রাখে বাসার ভিতরে ওই কুঁজোর মতো ফোলা অংশটিতে। পুরুষ বাবুই বহুগামী। তারা একটি স্ত্রী পাখির সাথে মিলিত হওয়ার পরেই আবার নতুন বাসা বানাতে শুরু করে অন্য কোনো স্ত্রী বাবুইকে আকৃষ্ট করার জন্যে। এভাবেই চলতে থাকে ওদের বংশপরম্পরা….